ডাঃ এম এইচ মোহন
ইংরেজী নামঃ Jackfruit
বৈজ্ঞানিক নামঃ Artocarpus Heterophyllus
গ্রাম বাংলার অতি চীরচেনা ফল তাল। আকাশ পানে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকা
সারি সারি তালগাছ, গাছে-গাছে ধরা তালফল ও বাবুই পাখির ঝুলমত্ম মনোরম বাসা
এবং পাখির কলতান কার না ভাল লাগে। তালের আদি নিবাস মধ্যে আফ্রিকা হলেও
বাংলাদেশের সকল স্থানে ছোট বড় কম বেশী তাল গাছ চোখে পড়ে। তালফল ও তাল গাছের
বহুবিধ ব্যবহার ও পুষ্টি গুনাগুন বিবেচনায় দেশীয় ফলের মাঝে তালের অবদান
শীর্ষে। গুচ্ছ মূলী বৃহৎ অশাখ বৃক্ষ তাল, গাছের গোড়ার দিক মোটা, উপরের অংশ
তুলনা মূলক চীকন, কান্ডের মাথায় বোটা ও পাতা গুচ্ছ ভাবে সাজানো থাকে ও
বোটার দু-ধারে করাতের মতো দাঁত আছে। কোঁটা শক্ত ও পুরম্ন। গাছ উচ্চতায় ২০
থেকে ২৫ মিটার হয়ে থাকে এবং দীর্ঘ জীবি উদ্ভিদের মাঝে অন্যতম তাল। ১৪০ থেকে
১৫০ বছর বয়স পর্যমত্ম বেঁচে থাকে। তুলনা মূলক ভাবে রোগ বালাই কম। তাল
পুরম্নষ ও স্ত্রী উভয় লিঙ্গ গাছ, একই গাছে দু-রকম ফুল ফুটেনা। পুরম্নষ গাছে
ফুল হয়, ফল হয়না, ফুল জটা নামে পরিচিত। মঞ্জুরির রঙ হলুদ, লম্বা আকৃতির,
বসমেত্ম গাছে ফুল ধরে। পুরম্নষ তাল গাছের রেনু বাতাসে ভেসে অনেক দূর পথ
পাড়ি দিয়ে পরাগায়ন ঘটাতে সÿম। পুরম্নষ ও স্ত্রী ফুলের সঠিক পরাগায়নে সৃস্টি
হয় তালের। তাল গাছের বৃদ্ধি ধীর গতি সম্পন্ন, বীজ রোপনের ১০ থেকে ১৫ বছর
বয়সে গাছে ফল ধরে। গাছ প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০টি পর্যমত্ম ফল ধরে, তবে এর
পরিমান কম বেশী হতে পারে। গাছে কাঁদিতে ফল ধরে, একটি গাছে অনেক গুলি কাঁদি
ধরে, ফলের আকার গোলাকার চ্যাপ্টা, প্রতি ফলের গড় ওজন ১থেকে ৫ কেজি পর্যমত্ম
হয়, ফলের রঙ প্রথমে হলদে সবুৃজ, পরিপক্ক ফলের রঙ হলুদ, খয়েরী কালো রঙের
হয়। তাল ফলে এক থেকে দুটি বা তিনটি আটির ফল ধরতে দেখা যায়। ফল পাকে ভাদ্র
মাসে, তবে কোন কোন গাছে বছরের অন্যসময় ফল ধরতে দেখা যায়। পাকা ফলের ঘ্রাণ
তিব্র সু- গন্ধ যুক্ত, স্বাধে মিষ্টি থেকে পানসে মিষ্টি হয়। গাছে পাকা তাল
আপনা আপনি ঝরে পড়ে।
এ যাবৎ পর্যমত্ম তালের কোন অনুমোদিত জাত নেই, সকল জাত স্থানীয়, তবে আকার আকৃতি স্বাধ-গন্ধ বিবেচনায় উত্তম, মাধ্যম ও নিমণমানের হয়।
আমাদের দেশের সকল জেলায় কম-বেশী তাল গাছ জন্মে তবে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ,
গাজীপুর, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে ভালো তাল উৎপাদন হয়। প্রায় সব ধরনের
মাটিতে তাল গাছ জন্মে।
সহজ রোপন পদ্ধতি, কষ্ট সহিষু, কম যত্নে
উৎপাদন ও বৃদ্ধির ফলে গ্রামীন সড়ক, মহাসড়ক, বাঁধ বেড়িবাঁধ, রেল লাইন, পুকুর
পাড়, খালের পাড়, নদীর পাড়, জমির আইল, পতিত জমি ও বসত বাড়ীর শেষ সীমানায়
তাল গাছ রোপন উপযোগী স্থান। উলেস্নখ্য গভীর মূলী ও শাখা প্রশাখা নেই বলে
জমির আইলে রোপনে খাদ্য পুষ্টির প্রতিযোগিতা ও ছায়া দিয়ে ফসলের ক্ষতি করে
না।
তালের বহুবিধ ব্যবহার যেমন ঃ–
তালের পাতা দিয়ে হাত পাখা, মাদুর, টুপি, ঘরের ছাউনী, চাটাই, ছাতা, লাকরী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গাছের ফাইবার বা আঁশ থেকে বিভিন্ন রকমের সৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়, যথা-
টুপি, ঝুড়ি, ব্রাশ পাপোষ, ছোট বাষ্কেট, ও মাছ ধরার চাইয়ে ব্যবহৃত হয়।
পুরম্নষ গাছের ফুল বা জটা হতে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে গুড়, পাটালি,
ভিনেগার, পিঠা, বড়া, লুচি, সডিনগাছ তৈরি করা হয়। পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা,
বড়া, খির, পায়েস তৈরি করা হয়।
কচি ও কাঁচা তালের নরম শাঁস মুখরোচক পুষ্টিকর ও ছোট বড় সবার প্রিয়। গ্রীষ্মের তৃষণা নিবারনে কাজ করে।
তাল কাঠের বহবিধ ব্যবহার লÿ করা যায়। যেমনঃ গাছের গোড়ার অংশ দিয়ে ডিঙ্গি
নৌকা তৈরি, এটি বহুল ব্যবহৃত। এছাড়া শক্ত ও মজবুত বলে ঘরের খুটি, আড়া,
রম্নয়া, বাটাম, কৃষকের লাঙ্গলের ঈষ তৈরি করা হয়।
গাছ শক্ত মজবুত গভীর মূলী বলে ঝড় তুফান, টর্নেডো, বাতাস প্রতিরোধ ও মাটি ÿয় রোধে তালের গাছের ভহমিকা অতুলনীয়।
তালের ঔষধী গুণাগুণঃ– তাল ব্যালসিয়াম সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার, তালের রস
শেস্নমানাশক, সূত্র বর্ধক, প্রদাহ ও কোষ্ঠ কাঠিন্য নিবারণ করে। রস থেকে
তৈরি তাল মিসরি সর্দি কাশিতে মহোষধ হিসেবে কাজ করে। যকৃতের দোষ নিবারক ও
পিত্তনাষক হিসেবেও কাজ করে।
তালে পুষ্টি উপাদান (প্রতি ১০০ গ্রাম)ঃ-
জলীয় অংশ = ৭৭.৫ ভাগ।
হজমযোগ্য আঁশ = ০.৫ ভাগ।
খনিজ পদার্থ = ০.৭ ভাগ।
খাদ্য শক্তি = ৮৭ ভাগ।
আমিষ = ০.২ ভাগ
শর্করা = ২০.৭ ভাগ।
ক্যালসিয়াম = ৯ ভাগ।
বর্তমান সমস্যা ও আগামীয় সম্ভাবনাঃ-
অজ্ঞতা ও দৈনন্দিন বিভিন্ন চাহিদার কারনে দিন দিন যেভাবে তাল গাছ নিধন করা
হচ্ছে এতে প্রকৃতি পরিবেশ হারাচ্ছে তার রূপ সৌন্দর্য। নয়নাভিরাম সারি সারি
তাল গাছ, গাছে গাছে তাল ফল ও তাল গাছে পাখির বাসা আজ তেমন দেখা যায়না।
আমরা একবারভভেবে দেখছি কী?
প্রতিবছর বৃÿ রোপন মৌসুমে অন্যান্য বৃÿ
চারার সহিত যদি তাল গাছের বীজ/চারা বেশী বেশী বারে সকলে রোপন করি এবং
নির্বিচারে তাল গাছ নিধন না করি কবে আমাদের এ দেশে আবারও উপকারী ফল তাল
ফিরে পাবে হারানো ঐতিহৃ। তারি সাথে সাথে নিশ্চিত হবে আগামীর খাদ্য অর্থ ও
সমৃদ্ধি।