হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জনক
মহাত্ম ডাক্তার ক্রিশ্চিয়ান ফেড্রিক স্যামুয়েল হানেম্যান
Doctor Christian Friedrich Samuel Hahnemann
আজ থেকে প্রায় আড়াইশত বছরের পূর্বে জার্মানীর ক্ষুদ্র নগরীর মিসেনে ; ছোট্ট এক ঘরে ১০ই এপ্রিল,১৭৫৫ খ্রিঃ মধ্য রাতের পরে ক্রিশ্চিয়ান গটফ্রায়েড হানেম্যানের উরুষে ও জোহানা ক্রিশ্চিয়ানের গর্ভজাত এক ফোট ফোটে সন্তানের জন্ম হয়, সে দিন কেইবা জানত-এযে শিশু জন্ম নিয়েছে এক মিটি মিটি করে জ্বলা ছোট্ট এক প্রদীপময় প্রায় অন্ধকার ঘরে, যে কিনা আজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে জ্ঞানের অতি উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা। জরাজীর্ণ আর্থ পীড়িত মানবতার স্বাস্থ্য যে দিনছিল- অবহেলিত, অন্ধকারাচ্ছন্ন, কু-সংস্কার পূর্ণ তথাকথিত অপচিকিৎসার গহীনতলায়, আর যে কিনা ছড়িয়ে দিয়েছে সদৃশ বিধানের শান্তিময় চিকিৎসার এক সুখ বার্তা। যে ছোট্ট বট বৃক্ষের চারা গাছটি আজ মূল শিকড় প্রকান্ড ছাড়িয়ে ভূতল ধরেছে মজবুত ভাবে আকড়ে আর শাখা প্রশাখার সুবিশাল বিস্তৃতি দিয়ে বিশ্বময় শান্তির সু-শীতল ছায়া দিয়ে ঢেকে রেখেছে রোগ ক্লিষ্ট জীব প্রানকে। যার শুধু একবার জন্মই হয়েছে-মৃত্যু আর নেই। সে মৃত্যুঞ্জয়ী মহা মানব মহাত্মা ডাক্তার ক্রিশ্চিয়ান ফেড্রিক স্যামুয়েল হানেম্যানের সুবিশাল সমুদ্রসম কর্মময় জীবনের কতটুকুই বা আমি আপনাদের কাছে তুলে ধরতে পারব খন্ড কাগজের কয়েক লাইনে।এযেন এহেন সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে সাগর দেখারই নামান্তর।
হানেম্যানের পিতা চিনামাটির বর্তনে চিত্রাঙ্কন করতেন। একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি হিসাবে সন্তানদেরও তিনি সেভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। যদিও তার সাধ্য ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। হানেম্যানের প্রতি তার উপদেশ ছিল- “জ্ঞানকে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ করবা”। সে মোতাবেক হানেম্যান শিক্ষা জীবন শুরু এবং অতিবাহিত করতে লাগেন আর এ মর্ম বানী তাকে জার্মানীর গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব বিখ্যাত করে তুলে।
শিক্ষা জীবনের হাতে খড়ি বাবা-মায়ের হাতেই। ১২ বৎসর বয়সে ১৭৬৭ খ্রিঃ মিসেনের টাউন স্কুলে ভর্তি হন। জীবনের শুরুতেই তার প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখে আসেন। ক্লাশের পড়া/ পাঠে সীমাবদ্ধ না থেকে চোখ খুলেন দশ দিগন্তে। আয়ত্ব করতে থাকেন বিভিন্ন ভাষা। মাত্র ২২ বৎসর বয়সেই ১১টা ভাষা জানতেন এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর বিভিন্ন ভাষা লিখা বই পড়তেন, অনুবাদ করতেন, গবেষণা করতেন। একাধারে তিনি ছিলেন ভাষাবিদ, অনুবাদক, রসায়নবিদ, বৈজ্ঞানিক, সমাজসেবক, উদ্ভিদবিদ্যা বিশারদ, সার্জন, মনস্তাত্ত্বিক, সত্যবাদী, বাস্তববাদী, চিকিৎসা বিজ্ঞানীই শুধু নন, স্বাস্থ্য বিশারদ ও স্বাস্থ্যের রক্ষকও বটে। ছাত্র অবস্থায়ই তিনি তার পূর্বের আড়াই হাজার বৎসরের চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করে ইতিহাস জানেন, পর্যালোচনা করে গবেষণা করেন, নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে চিন্তা করে প্রাচীন চিকিৎসার সুফল দেখে যতটানা আনন্দিত হন,তার কূপল দেখে বিস্মিত হন,চমকিত হন, হতবম্ভ্য হন তার চেয়ে শতগুন বেশী। ১৭৭৮ খ্রিঃ থেকে ১৭৭৯ খ্রিঃ পর্যন্ত ছাত্র অবস্থায়ই ট্রাসলিভেনিয়ার গভর্নরের ফ্যামিলি চিকিৎসক ছিলেন। পাশাপাশি বাহিরেও রোগী দেখতেন। ১৭৭৯ খ্রিঃ ১০ই আগষ্ট জার্মানীর আরলাংগেন বিশ্ববিদ্যালয় হতে তৎকালীন জার্মানীর সর্বোচ্চ ডিগ্রী এম.ডি.লাভ করেন। ১৭৮১ খ্রিঃ হানেম্যান ম্যাগডিবার্গের গোমেরনে জেলা মেডিক্যাল অফিসার নিযুক্ত হন। সেখানেও প্রচলিত এলো চিকিৎসার কূপল দেখে তীব্র সমালোচনা করে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রবন্ধের মাধ্যমে তা তুলে ধরেন। ১৭৮৫ সালের শেষ দিকে হানেম্যান ড্রেসডেনে আসেন ১ বৎসর সময় ব্যাপি বিভিন্ন এলোপ্যাথি হাসপাতালে কাজ করেন এবং চিকিৎসার উপর দক্ষতা অর্জন করেন এবং ১৭৮৫-১৭৮৬ সাল পর্যন্ত এলোপ্যাথি চিকিৎসার প্রতি বিরাগবাজনের কথা তুলে ধরেন বিভিন্ন প্রবন্ধের মাধ্যমে। ১৭৮৯ সালের শেষভাগে লাইফজিকে চিকিৎসা শুরু করেন। এসময় যৌনরোগে সার্জনদের নির্দেশ, জলাতংক রোগের চিকিৎসা এবং সিফলিমের চিকিৎসা এবং সুক্ষ মাত্রা ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করেন।
হানেম্যানের দীর্ঘ গবেষণা হাজার হাজার বৎসরের চিকিৎসার ইতিহাস এবং নিজের চিকিৎসা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে পান যে, প্রচলিত চিকিৎসায় রোগীর সাময়িক উপশম দিতে পারে মাত্র। পুনরায় আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে, অথবা অন্য কোন নামের রোগে বা ধরনে ফিরে আসে । রোগী পায় যাতনা, ঘটে মৃত্যু। মনে শান্তি না পেয়ে হলেন উদ্যোলিত, চিন্তিত, যেখানে তিনি দিতে এলেন পীড়িতের সেবা সেখানে দূর্ভোগ যাতনা দেখে প্রচলিত চিকিৎসা থেকে নিজেকে সংকোচিত করে নিতে থাকেন। অনুবাদ ও রসায়ন বিষয়ে গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে।
তৎকালে সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী অত্যন্ত জ্ঞানী একনিষ্ঠ প্রগতিশীল সফল ডাক্তার হয়েও জীবন জীবিকার সন্ধানে এবং সত্যনুসন্ধানে অনুবাদের কাজে নামেন পুনরায়। ১৭৯০ খ্রিঃ হানেম্যান ডাঃ উইলিয়াম কালেন-এর “এ ট্রিয়েটিস অন ম্যাটিরিয়া মেডিকা” বই ইংরেজী হতে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে “সিংকোনা” অধ্যায়ে দেখেন সিংকোনা কম্প জ্বরের/ম্যালেরিয়ার ঔষধ রূপে ব্যবহৃত হয় আর তা সুস্থ্যাবস্থায় ম্যালেরিয়ার সৃষ্টি করে।
জ্ঞান পিপাসু সত্যানুরাগী, সিংকোনার ছালের রস নিয়ে নিজের উপরেই প্রয়োগ করেন ফলে তার সুস্থ্য শরীরে ম্যালেরিয়া জ্বরে সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় একের পর এক ঔষধ পরীক্ষায় এ সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারেন যে, যে ঔষধ বৃহৎ মাত্রায় সুস্থ্য শরীরে যে যে রোগ লক্ষণের উৎপত্তি করতে সক্ষম হয় স্বল্প/ক্ষুদ্র মাত্রায় সে সে লক্ষণের/রোগের অবসান/আরোগ্য করতেও সক্ষম।
১৭৯০ খ্রিঃ থেকে ১৮৩৯ খ্রিঃ পর্যন্ত হানেম্যান নিজের এবং অন্যান্য ৫০জন সুস্থ্য মানুষের/পরীক্ষকদের উপর ১০০ ঔষধ পরীক্ষা করেন এবং যার প্রত্যেকটি সদৃশ লক্ষণে আরোগ্য দিতে সক্ষম তখন এবং এখনও। এবং তিনি বদ্ধপরিকর হন যে, প্রকৃতির সঙ্গে বিরুদ্ধাচরন করে আদর্শ আরোগ্য কোন দিনই সম্ভব ছিল না, সম্ভব হবেও না। আদর্শ আরোগ্যের একটি মাত্র সরল পথই আছে আর এ হলো “Similia Similibus Curantur” বা “সমঃ সমং সমতিঃ” অথবা যেমন প্রাকৃতিক রোগ শরীরে আছে তেমন একটি কৃত্তিম রোগ সৃষ্টিকারী ঔষধ দিয়েই তা নিরাময় সম্ভব।
১৭৮০ খ্রিঃ হতে ১৭৯২ খ্রিঃ পর্যন্ত এলোপ্যাথি চিকিৎসা করলেও ১৭৯২ হতে ১৮০৪ পর্যন্ত এলোর পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রদান করেছিলেন। ১৮০৫ সাল হতে শুধু মাত্র হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সেবাই তিনি দিয়ে যান বাকী জীবন।
হানেম্যান যখন প্রচলিত চিকিৎসা ছেড়ে দিয়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রদান শুরু করেন তার উপরে নেমে আসে কালো ছায়া। ১৮১১ সাল থেকে ১৮২১ সাল পর্যন্ত তার কাটে সংঘাতময় জীবন। তখন বিরুদ্ধবাদী চিকিৎসকেরা তার বিরুদ্ধে নানা চক্রান্তে লিপ্ত হন তাই তাকে বার বার নানা স্থানে যেতে হয়েছে। এছাড়াও তিনি গবেষণার কাজে, পড়াশোনার কাজে, নিজের চেঞ্জের কাজে, আবিস্কারের কাজে সর্বোপরি চিকিৎসার কাজে জন্মের সময় জার্মানীর মিসেন থেকে শুরু করে ১৮৪৩ সালে মৃত্যু/পরলোক গমন কালপর্যন্ত প্যারিসের উত্তরে রুই দ্যা মিলানে অবদি কম বেশী ৩২ স্থানে তাকে অবস্থান করতে হয়েছে। এরই মধ্যে শিশু পুত্রের মৃত্যুসহ অনেক নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু হয়। সকল প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে জ্ঞান পিপাসু জ্ঞানের তাপষ, আত্ম প্রত্যয়ী, সত্যানুসন্ধানী, অধ্যাবসায়ী, দৃঢ়তা নিয়ে সফল হতে সফলতার চূড়ায় উড্ডিয়ন করতে থাকেন অবলিলায়।
কেন ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে থাকবেন না ?
মহাত্ম সামুয়েল হানেম্যানের জীবনে সবচেয়ে বড় আবিস্কার হল “Similia Similibus Curantur” অর্থাৎ সদৃশদ্বারা সদৃশকে পতিহত করা। যা আবিস্কারের পর সারা বিশ্বের সকল প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন মাত্রা যোগ হলো স্বাস্থ্য সেবায়। যা প্রাকৃতিক নিয়ম মাফিক, সদৃশ মতানুযায়ী, সর্বাধিক আদর্শ-আরোগ্যের সুপান। যে আরোগ্যের বিধানই হলো দ্রুত নিরাময়; কষ্টহীনভাবে রোগ নিরাময় করা, অত্যন্ত বিশ্বস্ত উপায়ে; সহজবোধ্য নীতি অনুসারে ; স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যের পুনঃ স্থাপন করা ; এবং ব্যধির মূলোচ্ছেদ সাধন করা; রোগকে চাপা দেওয়া, সাময়িক উপশম দেয়া; একটার চিকিৎসা দিয়ে আরো কয়েকটা নতুন রোগের সৃষ্টি করা না।
মহাত্মা স্যামুয়েল হানেম্যানই সর্ব প্রথম অনুধাবন করেন যে, মানুষ রোগ আক্রান্ত হলে সে অসুস্থ্য হয়, অসুস্থ্য হয় তার মানসিক অবস্থারও দূর্বলতার বর্হিপ্রকাশ হয় তার ভীতরের যে তেজসক্রিয়তা থাকে আর চিকিৎসা দিতে হলে দিতে হয় সেই তেজসক্রিয়তা সম্পূর্ন মনের সমন্নয়ে যে শরীরটা আছে সম্পূর্নটার, আংশিক বা কোন একটা নামকরণকৃত রোগ বিশেষের না।
উদাহরন স্বরূপ যদি আমরা একটা বৃহৎ আম গাছ কে চিন্তা করি, যা অনেক বড়, হাজারো শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট এর কোন ছোট একটা শাখার প্রান্তে আমের ফুল হয়েছে, প্রস্ফুটিত হয়ে মুকুল হয়েছে, এক সময় বেশ ভাল একটা আম হতে যাচ্ছে, আর যদি চিন্তা করি যে, আমটাই আমার দরকার তাই এত বিশাল গাছটার যত্ন নিব কেন শুধু আমটারই যত্ন করি, বড় করি, পাকাই। সুস্বাদু করে তুলি। পুরো গাছটা যদি শুকিয়ে যায়, খাবারের অভাব থাকে, প্রতিকুল পরিবেশের সম্মুখিন হয়, তাহলে যেমনিভাবে আমটাকে কাংখিত করে তুলা সম্ভব নয়। বা কাংখিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে না কোন ক্রমে। তাহলে আমরা কিভাবে এ চিন্তাতেই সিমাবদ্ধ থাকি যে রোগের নামে চিকিৎসা করে আংগিক, স্থানিক চিকিৎসা দিয়ে সম্পূর্ণ মানবশরীরটাকে সুস্থ্য করে তুলব। শরীরে কোন একটা সামান্য স্থানে যদি চিমটি কাটা হয় তাহলে পুরো মানুষটার শরীর এবং অ-দেখা মনটাও যেখানে ওহ বলে চিৎকার করে উঠে তাহলে কিভাবে মানসিক অবস্থাকে বাদ দিয়ে শরীরিয় বস্তুর অংশকে চিন্তা করব ?
তাই সর্ব প্রথম হানেম্যানই দ্যার্থ কন্ঠে বলে গেছে Treat the Patient, not the disease,
Treat the patient wholly not partly or organwise (রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা কর, রোগীকে আংশিক বা আংগিকভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা কর)। সেই প্রাচীন কাল থেকে অদ্যাবধি রোগের শ্রেণী করণ আর আংগিক হাসপাতাল তৈরী হয়েই যাচ্ছে যা কোন দিন শেষ হওয়ার নয়। নিত্য নতুন নাম করনই দেখে যেতে হবে সেই ছোট্ট শরীরটিতে (আমার কাছে মনে হয় এযেন বাংলাদেশ হওয়ার পর ঢাকার সেই সময়ে ম্যাপ/ জমির নকশাটা কেটে কেটে যেমন বহু খন্ডে খন্ডিত করা হয়েছে। আর খন্ড করা যাচ্ছেনা এখন, বিল্ডিং করে উপরে খন্ড খন্ড করা হচ্ছে আলাদা আলাদা ব্যক্তির নামে (ঠিক তেমনটা)।
জীবনী শক্তি:- শরীর ও মনের স্বাভাবিক অবস্থাকে বলা হয় স্বাস্থ্য। জীব দেহের ভেতরে অবস্থিত যে সূক্ষ্য গতিশীল, প্রাকৃতিক শক্তি শরীর ও মনের স্বাভাবিক অনুভূতি কর্মতৎপরতা গঠন কাঠামো রক্ষা, জীবটাকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করছে তাকে হানেম্যান Vital Energy নামে অভিহিত করেন। যা জীবের ক্রিয়া ক্ষমতা, সুস্থাবস্থায় জীবকে তার ক্ষমতার মাধ্যমে পরিচালনা এবং রক্ষা করে। অসুস্থাবস্তায় এ শক্তির ক্ষমতা ব্যহত হয় সদৃশ লক্ষণ সম্পূর্ণ ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে জীবনী শক্তির কার্যকরী ক্ষমতা আবার স্বাভাবিক হয়। এধারনা হানেম্যানই দিয়ে যান।
বাল্যকাল, শিক্ষা জীবন, দীর্ঘ চলার পথ পরিক্রমার কথা নাই তুলে ধরলাম। তার মধ্য বয়সের কিছু কথা না বললে যে নয়ই।
Ø
ভাষাবিদ:- ১১ টা ভাষার উপর ছিল তার পূর্ণ দখল এছাড়াও অনেক ভাষা সম্বন্ধে ধারনা ছিল।
Ø
অনুবাদক:- অনেক ভাষা জানা থাকার দরুণ প্রচুর অনুবাদের কাজ করেছেন। অনেক অসাধ্যও সাধন করতে, আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছেন, বিজ্ঞান, রসায়ণ, চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষি বিদ্যা, দর্শন এমনকি সাধারন সাহিত্যও বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য অনুবাদ করেন।
Ø
লেখক:- সারা জীবন লেখুনির মাধ্যমে বই, বিজ্ঞান আবিস্কারের অসাধারন প্রবন্ধ রচনা করে যান যার তুলনা শুধু হানেম্যান নিজেই।
Ø
শিক্ষক:- ছাত্র জীবনেই হানেম্যান ভাষা শিক্ষার শিক্ষক ছিলেন। লাইপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হোমিওপ্যাথি বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন, তাঁর ক্লাসে চিকিৎসক, আইনজীবি, বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশ ঘটত।
Ø
রসায়ণ বিদ:- রসায়ণে অসাধারণ অবদান রেখে যান হানেম্যান। বিখ্যাত রসায়ণবিদ বার্জেলিয়াস মন্তব্য করেন যে, হানেম্যান কেবলমাত্র রসায়ণবিদ হিসাবেই জগতে বিখ্যাত হয়ে থাকতে পারতেন।
Ø
এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা:- হানেম্যান পূর্বের আড়াই হাজার বৎসরের চিকিৎসার বিজ্ঞানের ইতিহাস অধ্যায়ণ করেন। ছাত্র জীবনেই ট্রানসিল ভেনিয়ার গভর্ণরের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। তৎকালে সর্বোচ্চ ডিগ্রী-এম.ডি. সম্পূর্ন করেন। গোমেরনে জেলা মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে চিকিৎসা প্রধান করেন। ১৭৮৯ সালে “স্বাস্থ্যের বন্ধু” বইতে জলাতংক রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে মূল্যবান বক্তব্য পেশ করেন।
Ø
ফার্মাসীস ও প্রস্তুতকারক:- হানেম্যান হোমিওপ্যাথির নতুন নতুন ঔষধ আবিস্কার, প্রস্তুত ও প্রচলন করেন।
Ø
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসাবে:- পৃথিবীর ইতিহাসে কত বৈজ্ঞানীক কত কিছুরই না আবিস্কার করে গেছেন। প্রায় প্রত্যেকেই পূর্বের কারো কিছু অংশ করে যাওয়া, এগিয়ে যায়, পথ দেখিয়ে যাওয়ার পর থেকে শুরু করেন এবং ক্রমান্নয়ে আজ অবধি যোগফলের সমষ্টির সফলতা। কিন্তু হানেম্যানই একমাত্র আবিস্কারক যে কিনা ১টা বীজ রুপন করে, চারা গাছ গজিয়ে বিশাল আকৃতির শাখা প্রশাখায় ফুলে ফলে সমৃদ্ধ করে রেখে গেছেন। যার কিনা সম্পূর্নটা কৃতিত্ব। এত ঘাত প্রতিঘাতের পর অর্থনৈতিক দৈন্যতা সত্বেও বিরুদ্ধাচারীদের বিরোধীতার মোকাবেলা করে, নিকট আত্মীয়ের বিয়োগের পরেও হাজারো বৎসরের প্রাচীন চিকিৎসার ইস্তফা দিয়ে একটা সম্পূর্ণ নতুন উদ্ভাবন পদ্ধতির চিকিৎসা দিয়ে শেষ জীবনে সমস্ত সম্পদ বিলিয়ে দিয়েও তৎকালে শেষ জীবনে চিকিৎসার মাধ্যমে ৪০ লক্ষ ফ্রাঙ্ক উর্পাজন করে রেখে গিয়েছিলেন।
হানেম্যানের যোগ্যতা ও অবদান:- বিশ্বময় ব্যাপৃত প্রসারিত ও স্বীকৃত ডাক্তার গজনের মন্তব্য দিয়ে শুরু করি তিনি বলেছেন-ঝিনুকের দেহে কোন বালু কনা ঢুকলে তা যে যন্ত্রণার সৃষ্টি করে এর ফলে এর দেহে জন্ম নেয় মুক্তা। ঠিক তেমনই হানেম্যারেন দারিদ্রতা, আপনজনদের একের পর একের মৃত্যু, প্রচলিত চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনুসারীদের সীমাহীন প্রতিকুল বাধা সৃষ্টির ফলেই জগতে হোমিওপ্যাথির তরু আবিস্কারের সম্ভব হয়েছে।
হানেম্যানের আবিস্কারের কয়েকটি বৈজ্ঞানিক আবিস্কার হলো-রসায়ণ ও ফার্মেসীতে মূল্যবান আবিস্কার ও অবদান।
Ø
সার্জারীতে ড্রাই ড্রেসিং ও অস্তি চাচন পদ্ধতি।
Ø
স্বাস্থ্যতত্ত্ব ও নাগরিক স্বাস্থ্য-যার মধ্যে পাগলা গারদ এতিমখানা ও জেলের স্বাস্থ্য বিধি দূর্দশা।
·
পরীক্ষামূলক ও আরোগ্যকারী সদৃশবিধানে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি।
·
সুস্থ মানব দেহে ঔষধ পরীক্ষা করে ঔষধের কার্যকরী ক্ষমতা নির্ধারন।
·
চিকিৎসা ক্ষেত্রে জীবনীশক্তি তত্তের আবিস্কার।
·
রোগ সংক্রমন তত্ত্ব ও কলেরার কারন (Cholera Miasm)
·
চির বা স্থায়ী রোগ তত্ত্ব।
·
অপরাধতত্ত্ব ও অপারাধ প্রবনতা।
·
রোগীর পূর্নাঙ্গ চিকিৎসা পদ্ধতি।
·
মানসিক রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি ও নির্যাতন মূলক চিকিৎসার বিরোধীতা।
·
ঔষধের শক্তিকরণ ও নতুন শক্তিকরণ (৫০সহঃ) পদ্ধতি।
·
ঔষধকে শক্তিকৃত ও সূক্ষ্য পরিবর্তিত মাত্রায় প্রয়োগ।
·
পথ্য বিজ্ঞানে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি, খাদ্যতত্ত্ব ও পথ্যাপথ্যের রচনাবলী (প্রকাশিত)
(১) হানেম্যান নিজের দেহে ১০০ টা ঔষধ প্রুভ করে লক্ষন আবিস্কার করে এবং সহযোগী প্রুভারদের প্রুভিংকৃত রিপোর্টের ওপর লেখা ১০ খন্ড বই।
(২) রসায়ণ ও চিকিৎসা বিদ্যার ওপর লেখা ৭০ টা মৌলিক রচনা ;
(৩) ২৪ জন লেখকের ইংরেজী, ল্যাটিন, ফরাসি ও ইটালিয়ান ভাষার লেখা থেকে জার্মান ভাষার অনুদিত ২৩ খানা বইয়ের সর্বমোট ৩২ খন্ড রচনা সম্ভার।
(৪) অর্গানন অফ মেডিসিন যার মধ্যে রয়েছে ২৯১টি অকাট্য সূত্র।
অপ্রকাশিত-(১) রোগীর কেইস রেকর্ড বহি ৫৪ খানা (২) রেপার্টরী ৪ খন্ড যার প্রত্যেক টাতে ১৫০০ করে পৃষ্ঠা, (৩) অর্গানন অফ মেডিসিন (৬ষ্ঠ সংস্করন) (৪) তার লেখা অসংখ্য রচনাবলি, পত্র পত্রিকা
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উপরে লিখা ৫টা প্রধান বইয়ের নাম-
(১) ফ্রাগমেন্টা দ্য ভিরিবাস মেডিকামেন্টোরাম পজিটিভ গিভ ইন
স্যানো কর্পোরি হিউম্যানো অবজাভেটিস
(২) অর্গানন ডার হেইলকুস্ত বা অর্গানন অফ মেডিসিন
(৩) ম্যাটিরিয়া মেডিকা পিউরা
(৪) রেপাটরীয়াম
(৫) ক্রনিক ডিজিজেস, দেয়ার পিকিউলিয়ার নেচার অ্যান্ড হোমিওপ্যাথি কিউর।
বাবা হিসাবে হানেম্যান:- বাবা হিসাবে হানেম্যান চমৎকার ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার প্রথমা স্ত্রী জোহানা হেনরিয়েটির গর্ভে হানেম্যানের ২ ছেলে এবং ৯ মেয়ের জন্ম হয়। অনেককেই উচ্চ শিক্ষিত ডাক্তার করে তুলেন। ছেলে মেয়েদের জন্য কবিতা লিখতেন আবৃতি করতেন। ঘুম পাড়ানোর গান শোনাতেন।
হানেম্যান প্রায় ৮০ বৎসর বয়সে ৩২ বৎসর বয়সের মদাম মেরি মেলানী ডিঃ হারভেলীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
মানুষ হিসাবে যদি হানেম্যানকে মূল্যায়ন করতে চাই তাহলে লক্ষ করব যে-
১। বাল্যকাল থেকেই হানেম্যান ছিলেন অত্যান্ত সরল, সৎ, ধৈর্যশীল, স্থির ও শান্ত প্রকৃতির।
২। শৈশব থেকেই অধ্যয়নশীল, জ্ঞানানুরাগী ও সত্যানুসন্ধ্যিসু ছিলেন।
৩। কৈশরেই হানেম্যান অবিচল, আস্থাশীল, মানবতাবাদী, একনিষ্ঠ, সীমাহীন, অধ্যাবসায়ী, কর্মক্ষমতা সম্পন্ন, অক্লান্ত পরিশ্রমী, শৈলপিক ক্ষমতার অধিকারী, বিচক্ষন, সাহসী, ক্ষমতাশীল, আবিস্কার নিজ পেশার প্রতি সচেতন।
৪। হানেম্যান জন্মগতভাবে একজন লুথারিয়ান তবুও তার সমস্ত চিন্তাও কর্মে এক ইশ্বরের অস্তিত্বকেই ধারণ করতেন, তার নিয়ন্ত্রণকেই স্বীকার করতেন।
৫। তিনি দার্শনিক ছিলেন এবং মনে করতেন দর্শন ছাড়া কোন বিজ্ঞান এমনকি চিকিৎসা বিজ্ঞানও চলতে পারে না। ক্যান্ট ও প্লেটোর দর্শনে তিনি অভূয়িসি প্রশংসা করেন।
৬। তিনি মহান দেশ প্রেমিকও ছিলেন।
৭। তিনি মাজ সংস্কৃতির অনুরাগী ছিলেন। শেষ জীবনে অপেরা দেখতেন।
৮। হানেম্যান মার্জিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত একজন দায়িত্বশীল গৃহকর্তা ছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি যেমন জাগ্রত, বিখ্যাত ছিলেন তেমনি ধার্মিক, সামাজিক, আধ্যাতিক, দার্শনিক, সত্যানুসন্ধ্যানিও ছিলেন যার তুলনা শুধুই একজন হানেম্যান।
হোমিওপ্যাথ কনসালটেন্ট
লেকচারার,ডাঃ এম এইচ মোহন
চাঁদপুর হোমিওপ্যাথিক
মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ।

No comments:
Post a Comment